সর্বশেষ

Monday, October 3, 2016

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণে ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত যা বললেন..

চান্দিনা প্রতিদিন ডেস্ক: ১৯৬৩ সালে মহিচাইল হাই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আবদুল কাদির মজুমদার স্যার। তার কথা ভোলা সম্ভব নয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৩৭ সালে গ্র্যাজুয়েশন করেন। সেই আমলে এই মাপের শিক্ষা দিয়ে অনেক বড় বড় পদে যাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু কাদির স্যার শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিলেন। শুধু তাই নয়, নিজ গ্রামে এসে তিনি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষাদান শুরু করলেন। স্যার ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন ও সুঠাম দেহের অধিকারী। স্কুলের বারান্দা দিয়ে হাঁটলে মনে হতো যেন, একজন দেবতা চলছেন। আমি ছিলাম তার খুবই প্রিয় ছাত্র। যদিও আমার মনে আজ অবধি একটা কাঁটা বিঁধে আছে, আমি মনে হয় স্যারকে কষ্ট দিয়েছি। ঘটনাটা নবম শ্রেণীতে ওঠার সময়কার। যেহেতু আমার
এক দাদু ডাক্তার ছিলেন, বাড়ির সবার আকাক্সক্ষা ছিল, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব। তাই আমাকে অবশ্যই বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে হবে। কিন্তু আমাদের স্কুলে তখন বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না। ফলে আমাকে স্কুল পরিবর্তন করতে হবে। গন্তব্য ছিল আমাদের গ্রাম থেকে প্রায় আট মাইল দূরের চান্দিনা পাইলট হাই স্কুল। কিন্তু স্যার কোনোমতেই রাজি না। তিনি তার স্কুল থেকে আমাকে ছাড়বেন না। সেটা কোনো ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্য নয়, গ্রামের অন্যদের শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার জন্য।
স্যার আমাকে অনেক বোঝালেন। স্যারের বক্তব্য ছিল, আমি নিশ্চয়ই মেট্রিকে ভালো ফলাফল করব। তা দেখে গ্রামের অন্যরাও স্কুলে তাদের সন্তানদের ভর্তি করাতে আগ্রহী হবে। ছাত্রদের মধ্যে ভালো ফলাফল করার আগ্রহ বাড়বে। এর মাধ্যমে গ্রামে শিক্ষার একটা গুরুত্ব তৈরি হবে। কিন্তু আমি তো সায়েন্স পড়তে চাই। স্যার আমাকে কিছুতেই টিসি দেবেন না। তিনি বোঝালেন, মেট্রিকে আর্টস পড়েও তো ইন্টারে সায়েন্স পড়ে মেডিকেল পড়া যাবে। কিন্তু আমার বাবা বললেন, এতে আমি পিছিয়ে যাব। শেষে স্যার আমাকে টিসি দিলেন, এর মধ্যে দুই মাস পার হয়ে গেল। স্যারের সম্মান এরকম ছিল যে, তার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বাবা তো দূরে থাক, এমনকি দাদুও কথা বলার সাহস পেতেন না। এজন্য এত সময় লেগে গিয়েছিল।
কাদির স্যারের গল্প বলে শেষ করা যাবে না। এইট থেকে নাইনে ওঠার সময় সেকেন্ড বয় নূরুল ইসলাম ও আমার মার্কসের ব্যবধানটা খুবই কম ছিল, আমি ছয় নাম্বার বেশি পেয়েছিলাম। ইংরেজীতে আমি সেবার একটায় ৮০ ও অন্যটায় ৮২ পেয়েছিলাম। ইংরেজীর শিক্ষক ছিলেন ফণীভূষণ স্যার। নূরুল ইসলাম আবার ছিলেন ওই স্কুলেরই এক শিক্ষকের ভাই। ওই স্যার কাদির স্যারের কাছে অভিযোগ করলেন, ফণীভূষণ বাবু আমাকে হিন্দু বলে বেশি নাম্বার দিয়েছেন যেন আমি ফার্স্ট হতে পারি। এই হিন্দু-মুসলিম বিভেদটা সে সময় আস্তে আস্তে বাড়ছিল, সম্ভবত রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা পাকিস্তানী শাসকদের নানা অপপ্রচারের ফলেই। যাই হোক, কাদির স্যার সব শুনলেন। তার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি সবার অভিযোগই গুরুত্বের সঙ্গে নিতেন এবং বিচার, বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত দিতেন। তিনি কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন ন্যায়বিচারের প্রতীক। তার বিচারিক যোগ্যতা আমি বলব যে, বর্তমানের অনেক বিচারকের চেয়েও ভাল ছিল। তিনি ইংরেজী খাতা দুটো চেয়ে পাঠালেন, নিজে দেখে নতুন করে নাম্বার দিলেন। আমি এবং নূরুল ইসলাম তখন স্যারের রুমের বাইরে বসা। ফণীভূষণ স্যারকে ডেকে পাঠানো হলো। এটা দেখে আমি ভাবলাম, আমাকে নিশ্চয়ই স্যার বেশি নাম্বার দিয়েছেন, নইলে তাকে কেন ক্লাস বন্ধ রেখে ডেকে পাঠানো হবে! কাদির স্যার তখন ফণীভূষণ স্যারকে বললেন, আমি খাতা দেখলাম, আপনি যে প্রাণ গোপালকে ৮০ দিলেন, এখানে তো সে ৮৬ পাবে। আর নূরুল ইসলাম ওই খাতায় পেয়েছিল ৭৮। স্যার খাতা কেটে তার চার নাম্বার কমিয়ে ৭৪ করে দিলেন। এরপর ফণীভূষণ স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে বলুন, কেন একজনকে প্রাপ্য মার্কস কমিয়ে দিলেন, আর অন্যজনকে বাড়িয়ে দিলেন? ফণীভূষণ স্যার বললেন, আমি দেখেছি যে গোপাল আরও বেশি মার্কস পায়, আর নূরু কিছু কম পায়। কিন্তু যেহেতু আমরা দু’জনেই হিন্দু, তাই প্রাণ গোপাল বেশি মার্কস পেলে এ ধরনের কথা উঠতে পারে ভেবেই তাকে কমিয়ে দিয়েছি। কাদির স্যার তখন তাকে শিক্ষকের দায়িত্ব বোঝালেন। কে কি ভাবল তার কাছে মাথা নত না করে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিলেন।
নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ার দিন দাদুকে সঙ্গে নিয়ে ভয়ে ভয়ে কাদির স্যারের কাছে বিদায় নিতে গেলাম। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন, দোয়া করলেন। স্যারের বড় ভাই স্কুলের হেড মৌলভী রহিম বক্স মজুমদার হুজুর কোরান শরীফের বিভিন্ন অংশ থেকে সূরা পড়ে মাথায় ফুঁ দিয়ে আমাকে দোয়া করলেন। প্রায় আধ ঘণ্টা সময় ধরে চলেছিল এই দোয়া পর্ব। এই শিক্ষকদের কাছ থেকেই আমি শিক্ষকের কর্তব্য এবং অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা পেয়েছিলাম। রহিম বক্স মজুমদার হুজুর স্কুলে আরবি পড়াতেন। যদি কোনোদিন বাংলা স্যার না আসতেন তিনি সেদিন বাংলা পড়াতেন। এরকমই একদিন হুজুর আমাদের কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা পড়াচ্ছিলেন। সেই কবিতাটা- ‘গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান’। তখন আমার ছোটবেলার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু খালেক মজুমদার স্যারকে একটা প্রশ্ন করল। সে আমাদের চেয়ে একটু বড় ছিল বয়সে, আমরা তো স্যারদের উটকো প্রশ্ন করার সাহস করতাম না। খালেক বলল, হুজুর হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, সবাই কি আসলে সমান? মুসলমানরা কি অন্যদের চেয়ে উন্নত নয়? হুজুর তখন একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝালেন। বললেন, প্রত্যেকটা মানুষই একই কাজ করে, খায়, ঘুমায়, বিয়ে করে, কাজ করে, জীবন যাপন করে। সবাই কেন একই রকম কাজ করে? কারণ তাদের সবাইকে একজন স্রষ্টাই সৃষ্টি করেছেন। এখন ধর গোপাল আর তুমি তো জানি দোস্ত। যদি গোপালের জন্ম হতো খালেক মজুমদারের মায়ের পেটে, তাহলে সে কিন্তু দস্ত না হয়ে মজুমদারই হতো। আর তুমি খালেক যদি ডাক্তার বাড়িতে জন্ম নিতে তাহলে তোমার নাম গোপাল কিংবা এরকম কিছুই হতো। তিনি আরও বললেন, ধর্মটা জন্মসূত্রে প্রাপ্ত! এই পরিচয়টা আবার পাল্টেও যায়। সৃষ্টিকর্তা তাকে পাঠাচ্ছেন মানুষ হিসেবে। সে এসে কি করছে, তার কর্ম দিয়েই স্রষ্টা তাকে বিচার করে। চিন্তা করেন, একজন আরবি শিক্ষক এভাবে দেখতেন এটা কি আজ ভাবা সম্ভব? আজকাল তো ধর্মীয় অনুষ্ঠান মানেই অন্য ধর্মকে তুলোধুনো করা, গালিগালাজ করা। সাঈদীর মতো লোকদের ওয়াজ তো রীতিমতো অশ্লীল। এটা যে একা মুসলিমরা করে তা নয়, হিন্দুদেরও এরকম সংগঠন আছে! বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কেউই এর বাইরে নয়। মৌলবাদীরা সবখানেই আছে। কিন্তু সবাই মৌলবাদী নয়, হতে পারে না।

No comments:

Post a Comment

Adbox